
বাংলা ভাষার বিবর্তন এবং মধ্যভাগের ভাষাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য
প্রশ্ন: বাংলা ভাষার বিবর্তনের ইতিহসাকে মোট কয়টি ভাগে ভাগ করা যায়? মধ্যভাগের ভাষাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য আলোচনা কর।
আলোচনা: ভাষা কোন সুস্থির বিষয় নয়। এটি নিয়ত পরিবর্তনশীল। কোন একটি নির্দিষ্ট ভাষা আজ যে রূপে আছে অতীতে তা ছিল না। কোন না কোন পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ভাষা এর বিবর্তন ধারাকে অব্যাহত রাখে। নব্য ভারতীয় আর্য ভাষার অন্যতম শাখা বাংলা সম্বন্ধেও উল্লিখিত মূল্যায়ন প্রাসঙ্গিত। কেননা, একটি নির্দিষ্ট বিবর্তনের মধ্য দিয়েই বাংলা বর্তমানের অবস্থায় উপনীত হয়েছে। ভাষাতাত্ত্বিকগণ বাংলা ভাষার এই বিবর্তন ইতিহাসকে মোট তিনটি ভাগে ভাগ করেছেন। এগুলো হলো নিম্নরূপঃ
ক. প্রাচীন যুগ (৬৫০ খৃ. থেকে ১৩৫০ খৃ.)
খ. মধ্যযুগ (১৩৫০ খৃ. থেকে ১৮০০ খৃ.)
গ. আধুনিক যুগ (১৮০০ খৃ. থেকে বর্তমানকাল পর্যন্ত)
নিচে মধ্যভাগের বাংলার ভাষাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য আলোচনা করা হলোঃ
মধ্যযুগের বাংলা ভাষায় দুটি স্তর দেখা যায়। যথা:
(ক) আদিমধ্য যুগ
(খ) অন্ত্যমধ্য যুগ।
আদিমধ্য যুগের স্থিতিকাল হলো- আনুমানিক ১৩৫০ খৃ.থেকে ১৫০০ খৃ.পর্যন্ত এবং অন্ত্যমধ্য যুগের স্থিতিকাল হলো ১৫০১ খৃ. থেকে ১৮০০ খৃ. পর্যন্ত।
১। ধ্বনি তত্ত্বে দিক থেকে দেখা যায় যে, প্রত্যেক শব্দের অন্ত্যস্বর উচ্চারিত হতো। যেমন: আইসু-আসু,কৌড়ি-কড়ি।
২। পাশাপাশি দুই স্বরের অবস্থান; অর্থাৎ পদ মধ্যে উদ্বৃত্ত স্বরের লোপ তখনও হয় নি। যেমন: বাড়াই, আউলাইল। ‘আ’- কারের বা আকারের পরই ‘ই’- কার বা ‘উ’-কার ক্ষীণভাবে উচ্চারিত হতো। সে জন্য ‘অই’, ‘আই’, ‘অউ’, ‘আউ’, এ ধরণের যৌগিক স্বরের উৎপত্তি হয়।
৩। পদমধ্যবর্তী মহাপ্রাণতা লোপ পায়নি। যেমন: বুঢ়া, দাঢ়ী ইত্যাদি।
৪। পদমধ্যবর্তী ‘হ’-কার তখনও লোপ পায়নি। যেমনঃ মধ্য বাংলা- মহাকাল> আ. বাং মাকাল, তবে পদের অন্ত ‘হ’- লুপ্ত হতে আরম্ভ করেছে। যেমন: বারহু> বার, বোলহ> বোল।
৫। ‘র’ এবং ল’ এর উচ্চারণের বিশেষ ব্যবধান ছিল না। সে জন্য বহু স্থানে ল এবং র-এর মিল দেখানো হয়েছে। যেমনঃ নীল জলদ সম কুস্তল ভারা। বেকত বিজুরী শোভে চম্কক মালা।
৬। ‘রা’- বিভক্তির যোগে সর্বনামে কর্তৃকারকের বহুবচনের পদ সৃষ্টি। যেমনঃ আহ্মারা, তোহ্মারা।
৭। করণ কারকে ‘অ’-কারান্ত, ‘উ’- কারান্ত শব্দের শেষে ‘এ’, ‘এ’ বিভক্তির প্রয়োগ। যেমন: স্তুতি এ তুষিল হরি জলের ভিতর।
৮। ক্রিয়া পদের উত্তম পুরুষের এক বচন ও বহু বচনের মধ্যে পার্থক্য ছিল। যেমন: এক বচন কঁরো, বহু বচনে কবি এ।
৯। অনুজ্ঞার প্রথম পুরুষের এক বচনের স্বার্থে ‘ক’ বিভক্তির বিকল্প প্রয়োগ দেখা যায়। যেমন: করু-করুক।
১০। ভবিষ্যৎ কালের প্রথম পুরুষের একবচনে ‘হে’ বিভক্তির প্রয়োগ দেখা যায়। যেমন: চলিহে> চলিবে।
১১। অকর্মক ক্রিয়ায় অতীত কাল কর্তায় স্ত্রী লিঙ্গ হলে স্ত্রী প্রত্যয় হতো। যেমন: রাহী গেলী,বড়ায়ি চলিলী।
অন্ত্য মধ্য বাংলার বৈশিষ্ট্য বা লক্ষণ
১। (ক) ‘ই’ ‘উ’ ধ্বনির অপিনিহিতি। যেমন; চারি > চাইর >, কালি> কাইল।
(খ) অপিনিহিত স্বরধ্বনির প্রভাবে চলিত ভাষায় পরিবর্তী স্বরধ্বনির অভিশ্রুতি। যেমন: করিয়া > কইর্যা > ক’রে।
২। পদের শেষে ‘অ’- কারের লোপ। যেমন: দাস ( উচ্চারণ-দাসঅ)- দাস-(উচ্চারণ- দাস্)।
৩। আদি অক্ষরে শ্বাসাগাতের ফলে মধ্য স্বরের লোপ। যেমন: ভাবনা ( ভাব্না), গামছা (গাম্ছা)।
৪। সাধু ও চলিত ভাষায় ‘ঢ়’- কারের এবং ‘ন হ ম হ’ এ দুই নাস্যিক্য মহাপ্রাণ ধ্বনির মহাপ্রাণতার লোপ। যেমন: কাহু-কান, বুঢ়-বুড়।
৫। বহুবচনের বিভক্তি হিসাবে কর্তায় রা বিভক্তির ব্যবহার। যেমন: লোকেরা, ছাত্ররা। নির্দেশক বহুবচনে- গুলি, গুলা ব্যবহার।
৬। ‘ইল’ ও ‘ইব’ অন্তক ক্রিয়া পদের বহুল পরিমাণে কর্তৃবাচ্যে প্রয়োগ।
৭। ‘আছ’ ধাতুর সাহয্যে যৌগিক ক্রিয়াপদ গঠন। যেমন: আসিছি।
৮। সংস্কৃত তৎসম শব্দের নাম ধাতু রূপ প্রয়োগ । যেমন: অনুব্রজি, সান্ত্বাইব।
৯। বহু পরিমাণে আরবি ফারসি এবং বেশ কিছু পর্তুগীজ শব্দের প্রবেশ।
১০। বৈষ্ণব পদাবলীতে ব্রজবুলি ভাষার প্রচলন। বিদ্যাপতি এই ভাষার প্রচলন করেন। মাত্রাবৃত্ত ছন্দে ব্রজবুলির পদ রচিত হয়েছিল।
ড. এ. আই. এম. মুসা
সহযোগী অধ্যাপক বাংলা
সরকারি বেগম রোকেয়া কলেজ।
+88 01713 211 910