
‘রসাত্মক বাক্যই কাব্য’
প্রসঙ্গ: ‘রসাত্মক বাক্যই কাব্য’ আলোচনা কর।
আলোচনা : যথার্থ কাব্য কী এবং কাব্যের আত্মা কী- এ নিয়ে প্রাচ্য কাব্যতাত্ত্বিকদের মধ্যে যথেষ্ট মতবিরোধ রয়েছে। অলঙ্কারবাদীদের মতে কাব্যের আত্মা হচ্ছে অলঙ্কার; রীতিবাদীরা বলেন রীতিই কাব্যের আত্মা; ধ্বনিবাদীরা বলেন ধ্বনিই কাব্যের আত্মা। অন্যদিকে বক্রোক্তিবাদীদের দাবী-বক্রোক্তিই কাব্যের আত্মা। তাঁরা বলেন-রীতি, ধ্বনি, রস সবই কক্রোক্তির অন্তর্ভূক্ত। তাই এর কোনটিই পৃথকভাবে কাব্যের আত্মা হতে পারে না। অতএব বক্রোক্তিই কাব্যের প্রাণ। আবার রসবাদীরা বলেন রসই কাব্যের সব। কারণ, কাব্যে অলঙ্কার, ধ্বনি, রীতি যাই প্রয়োগ করা হউক না কেন তা করা হয় রসপোলব্ধির জন্যই। সুতরাং রসই কাব্যের আত্মা বা রসাত্মক বাক্যই কাব্য।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে রস আসলে কী? প্রাচ্য-অলঙ্কার শাস্ত্রে ‘রস’ একটি পারিভাষিক শব্দ। রস ধাতুর মূল অর্থ হচ্ছে, আস্বাদন করা। অর্থাৎ যা আস্বাদন করা হয় তাই রস। তবে রসের স্বরূপ ও সংজ্ঞার্থ নির্ণয়ে প্রাচ্য অলঙ্কারিকগণ এক মত হতে পারেননি। তাঁরা বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে রসের সংজ্ঞা দিতে চেষ্টা করেছেন। প্রাচ্য আলঙ্কারিক মনীষী ভরত রসের সংজ্ঞার্থে নির্ণয় করতে গিয়ে যা বলেছেন তার সারাৎসার হচ্ছে---‘আস্বাদ্যত্বা্ৎ’; অর্থৎ ‘যা আস্বাদিত হয়’-তাই রস। বিশ্বনাথ কবিরাজ তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘সাহিত্য দপর্ণ’-এ ভরতকে প্রতিধ্বনিত করেই রসের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেন-“রস্যতে ইতি রসঃ”। অর্থাৎ যা রসিত বা আস্বাদিত হয় তাই রস।
রসসৃষ্টির মনোরম বিবরণ আছে আদি কবি বল্মীকির কবিত্বলাভের ঘটনা রামায়ণ কাব্যের জন্মকথার বর্ণনায়। ক্রৌঞ্চীর শোকে শোকার্ত হয়ে বল্মীকি সেই আদিকালে যা কিছু উচ্চারণ করেছিলেন, তার নাম দিয়েছিলেন শ্লোক। শ্লোকবদ্ধ রামায়ণ কাব্যে প্রথম সৃষ্টি হলো রস এবং সেটি হলো করুণ রস। তবে রসতাত্ত্বিকগণ পরে বিশ্লেষণ করে দেছিয়েছেন যে, রামায়ণ কাব্যে শুধু করুণরস নয়, তাতে শৃঙ্গার, বীর, রৌদ্র, ভয়ানক ইত্যাদি অন্যান্য রসেরও প্রয়োগ হয়েছে। আদিকবি বাল্মীকির কণ্ঠনিঃসৃত শ্লোক থেকে এই যে রসসৃষ্টির ইতিহাস শুরু হয়েছে, তা আজও কাব্যনাট্যদি সাহিত্যের মধ্যে অব্যাহত আছে। যুগ যুগ ধরে কবি ও নাট্যকারেরা তাঁদের রচনা কর্মের মধ্যে বিচিত্র রসের সাধনা করে চলছেন।
এই রসসৃস্টির ইতিহাস, এই আদিকাব্য রামায়ণসৃষ্টির ইতিহাস স্মরণ রেখেই আনন্দবর্ধন বলেছেন-সেই রসই হচ্ছে কাব্যের আত্মা। ভরতমুনি তাঁর ‘নাট্যশাস্ত্রে’ নাট্যকর্মের বিশদ বিচার-বিশ্লেষণ করেছেন এবং এই সিদ্ধান্ত ঘোষণ করেছেন যে, রসই হচ্ছে নাটকের প্রাণ। নাট্যরসাদি সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেছেন যে, বীজস্বরূপ রস থেকে নাট্যস্বরূপ বৃক্ষ জন্মায়। এই ভাবে ভরতমুনি নাট্যকর্মের ক্ষেত্রে তাঁর বিখ্যাত রসবাদ বা রসাত্মবাদ সংস্থাপিত করেছেন। তিনি দৃশ্যকাব্য (নাটক) এবং শ্রুব্যকাব্য (কবিতা, মহাকাব্য, আখ্যানকাব্য) সম্বন্ধে অবহিত ছিলেন।
শ্রব্যকাব্যের ক্ষেত্রে অনেক দেরিতে রসের গুরুত্ব ও প্রাধান্য স্বীকৃতি পেয়েছে। তার কারণ, আচার্য ভরতের পূর্ববর্তী আলঙ্কারিকগণ, যেমন-ভামহ, দণ্ডী, বামন, উদ্ভট, রুদ্রট প্রভৃতি মীমাংসকগণ কাব্যের পুঙখানুপুঙখ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তার শরীরের দিকেই বেশি দৃষ্টিপা্ত করেছেন, তার আত্মার দিকে দৃষ্টিপাত করার চেষ্টা করেননি। ফলে কাব্যের কতগুলো বহিরঙ্গ তত্ত্ব-যেমন শব্দার্থতত্ত্ব, অলঙ্কারতত্ত্ব, গুণতত্ত্ব, রীতিতত্ত, বক্রোত্তিতত্ত্ব ইত্যাদি আলোচিত ও প্রতিষ্ঠিত হয়; কাব্যের কোন অন্তরঙ্গ তত্ত্ব উদঘাটিত হয়নি। এই কারণেই ভরতের অনুবর্তী প্রাচীন আচার্যরা রসের অস্তিত্ব সম্বন্ধে অবহিত থেকেও কাব্যের সারভূত পরমতত্ত্বরূপে রসকে প্রত্যক্ষভাবে নির্দেশ করেননি। যা পূর্বাচর্যরা করেননি তা করতে গিয়ে আচার্য আনন্দবর্ধন ঘোষণ করেন-রসই হচ্ছে কাব্যের আত্মা। ভরত কথিত নাট্যরসকে এই ভাবে কাব্যরস রূপে প্রতিষ্ঠিত করেন আনন্দবর্ধন। তাকে আরো বিস্তারিত করতে গিয়ে অভিনবগুপ্ত বলেন-‘রসশূন্য কোন কাব্য নেই’। মম্মট ভট্টের চিন্তায় অভিনব গুপ্তের চেয়ে এগিয়ে যান। তিনি তাঁর বিখ্যাত “কাব্যপ্রকাশ” গ্রন্থে বলেন-‘রসাত্মক বাক্যই কাব্য।’ সাহিত্যদর্পণকার বিশ্বনাথ কবিরাজ মস্মট ভট্টের প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিতকে বলিষ্ঠ ঘোষণায় রূপান্তরিত করেন।
তিনি বলেন-‘বাক্যং রসাত্মক কাব্যম’ অর্থ্যাৎ রসাত্মক বাক্যই কাব্য।
ড. এ. আই. এম. মুসা
বাংলা বিভাগ
সরকারি বেগম রোকেয়া কলেজ
রংপুর।
+88 01713 211 910